রংপুরে নুজসাতের রহস্যময় মৃত্যু: কাঠগড়ায় মেডিকেল শিক্ষার্থী সাকিন, উত্তর মিলবে তদন্তে?

নিজস্ব প্রতিবেদক:
​"প্রাইভেট পড়ানোই কি সাকিনের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল? ১৮ বছরের তরুণীর আকস্মিক চলে যাওয়া, একজন ২৫ বছরের মেডিকেল শিক্ষার্থীর হাজতবাস, আর এই দুই জীবনের মাঝখানে ঝুলে থাকা অসংখ্য অমীমাংসিত প্রশ্ন, অভিযোগ আর কুয়াশা।
​কয়েকদিন আগেও শাহরিয়ার আহমেদ সাকিন ছিলেন রংপুর মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের একজন স্বপ্নবাজ ছাত্র। সামনে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন আর টিউশন নিয়ে ছিল তার ব্যস্ত জীবন। কিন্তু আজ তিনি আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলার একমাত্র আসামি। কি ঘটেছিল এই শিক্ষক ও ছাত্রীর মধ্যে? কেন একটি মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো রংপুর শহরসহ গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিল?
​সাকিনের ভাষ্য ছিল ঠিক এমন— 'ও আমার স্টুডেন্ট ছিল। ওরা চারজন একসাথে একই ব্যাচে পড়ত। এক পর্যায়ে ও আমাকে পছন্দ করতে শুরু করে। আমি যখন এটা বুঝতে পারি, তখন ঝামেলা এড়াতে ওই ব্যাচেই পড়ানো বন্ধ করে দেই। পরে ওর মায়ের অনেক অনুরোধের পর আমি অন্য একটা ব্যাচে ওকে ভর্তি করি, আলাদা করে কখনো পড়াইনি। তারপরেও যখন দেখলাম ও আমার প্রতি দুর্বলতা দেখাচ্ছে আর হোয়াটসঅ্যাপে নক করছে, আমি ওর সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। সব জায়গা থেকেই ওকে ব্লক করে রেখেছিলাম। আমি এর সাথে কোনোভাবেই জড়িত না, ঘটনার সময়েও আমি অন্য ব্যাচে পড়াচ্ছিলাম।'
​সাকিনের এই দাবি যদি সত্যি হয়, তবে ঘটনাটি নিয়ে একদম ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়। একজন সচেতন শিক্ষক হিসেবে যখন তিনি দেখলেন ছাত্রী তার প্রতি দুর্বল, তখন তিনি দূরত্ব বজায় রেখেছেন, এমনকি সব যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ব্লক করে দিয়েছেন। সাধারণ দৃষ্টিতে একজন শিক্ষকের জন্য এটাই সবচেয়ে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারপরেও কেন সাকিনকে আজ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো?
​গল্পের অপর পিঠে রয়েছে মৃত নুজসাত পরিবারের পাহাড়সম ক্ষোভ আর অভিযোগ। নুজসাতের পরিবারের দাবি, মেয়েটি বেশ কিছুদিন ধরেই তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, আর তাদের আদরের মেয়ের এই মানসিক অবস্থার পেছনে সাকিনের কিছু গোপন ভূমিকা বা আচরণ দায়ী ছিল। পরিবারের এই অনড় দাবির ওপর ভিত্তি করেই সাকিনেরর বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা দেওয়া হয়।
​এখন বড় প্রশ্ন হলো, সাকিনের এই ব্লক করে দেওয়া এবং দূরত্ব বজায় রাখায় কি নুজসাতকে মানসিকভাবে আরও বেশি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সত্য লুকিয়ে আছে যা এখনো সামনে আসেনি?
​পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রংপুরের বিলাসবহুল নর্থভিউ হোটেল। গত সোমবার বিকেলে, এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজসাত জাহান একাই সেই হোটেলের নয়তলার ছাদে ওঠেন। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ, শ্বাসরুদ্ধকর ৪৮ মিনিট। নুজসাত ছাদের এমাথা ও মাথা অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন, কখনো তিনি ফোনে কারো সাথে তীব্র আবেগে কথা বলছিলেন। প্রায় ৪৮ মিনিট এই মানসিক যুদ্ধের পর এক পর্যায়ে তিনি ছাদের রেলিংয়ের ওপর বসেন, আর তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিচে পড়ে যান।
​সেই ৪৮ মিনিটে নুজসাত ফোনে কার সাথে কথা বলছিলেন? কার ওপর অভিমান করে তিনি রেলিংয়ের ওপরে পা বাড়িয়েছিলেন? এই রহস্যের উত্তর লুকিয়ে আছে নুজসাতের লক হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড আর মেসেজের ভেতরে।
​সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন এই নিয়ে তীব্র কাঁদা ছোড়াছুড়ি চলছে। কেউ সাকিনকে কাঠগড়ায় তুলছেন, আবার কেউ বলছেন, তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী বলা ঠিক নয়। আজ পুরো দেশের মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন— প্রাইভেট পড়ানোই কি সাকিনের জীবনের সবচেয়ে কাল হয়ে দাঁড়ালো? নাকি তদন্ত শেষে এমন কোনো নতুন তথ্য বেরিয়ে আসবে, যা পুরো দৃশ্যপট বদলে দেবে?
​চূড়ান্ত সত্য জানতে আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হবে আদালতের তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে।"

Post a Comment

0 Comments