প্রতিবন্ধী দুই সন্তানকে নিয়ে অসহায় মায়ের জীবনসংগ্রাম, সহায়তার আকুতি
মোঃ মকবুলার রহমান
ডোমার (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ১নং ভোগডাবুরী ইউনিয়নের উত্তর গোসাইগঞ্জ গ্রামের একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে বসবাস করেন মোছাঃ হাচিনা বেগম। চার বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর থেকে তিন সন্তানকে নিয়ে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছেন তিনি। জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী দুই সন্তানকে নিয়ে তার প্রতিটি দিন কাটছে অনিশ্চয়তা, অভাব আর সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হাচিনা বেগমের স্বামী মোঃ মশিয়ার রহমান প্রায় চার বছর আগে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। কিন্তু মাথা গোঁজার সামান্য আশ্রয় ছাড়া তাদের আর কোনো জমিজমা বা স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। অন্যের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চললেও সন্তানদের চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
তার দুই সন্তান, ১০ বছর বয়সী হাইউল ইসলাম ও ৫ বছর বয়সী লিমা আক্তার, জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তারা স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে, হাঁটতে কিংবা চলাফেরা করতে পারে না। প্রতিটি কাজেই তাদের মায়ের সহায়তার প্রয়োজন হয়। ফলে একদিকে সন্তানদের সার্বক্ষণিক পরিচর্যা, অন্যদিকে জীবিকার জন্য কাজ করার বাধ্যবাধকতা, এই দুই দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন হাচিনা বেগম।
পরিবারের বড় সন্তান লেখাপড়া চালিয়ে গেলেও অর্থাভাবে তার শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তার মুখে। বই, খাতা, পোশাক ও অন্যান্য শিক্ষাসামগ্রী সংগ্রহ করাও এখন পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে যেকোনো সময় তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবারটি।
হাচিনা বেগম জানান, অনেক দিন এমনও গেছে যখন ঘরে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে নিজে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে তাকে। দুই প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, ওষুধ, থেরাপি কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সামর্থ্যও তার নেই।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
"আমার একটাই চাওয়া, আমার সন্তানগুলো যেন বেঁচে থাকে। ওদের কষ্ট আমি আর সহ্য করতে পারি না। চিকিৎসা করানোর টাকা নেই, ঠিকমতো খাবারও দিতে পারি না। বড় সন্তানকে লেখাপড়া করাতে চাই, কিন্তু অভাবের কারণে সেটাও কঠিন হয়ে গেছে। আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান মানুষ ও মানবিক সংগঠনগুলোর কাছে অনুরোধ করছি, আমার সন্তানদের জন্য সবাই একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন।"
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে জীবনযাপন করছে। প্রতিবন্ধী দুই সন্তানের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা, পুনর্বাসন, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্য সহায়তা এবং বড় সন্তানের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত সহায়তা পৌঁছালে পরিবারটি নতুন করে বাঁচার আশা খুঁজে পাবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের মানবিক দৃষ্টিতে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
একজন অসহায় মায়ের চোখের জল যেন আর না ঝরে, দুই প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তায় হারিয়ে না যায়, সেই প্রত্যাশাই এখন এলাকাবাসীর।
Post a Comment