মানুষের হৃদয়ে আজও অমলিন মরহুম ছকিকুল আলম খোকন: নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল অধ্যায়
নিজস্ব প্রতিবেদক:
কিছু মানুষ কেবল একটি পদ অলংকৃত করেন না, তাঁরা নিজেদের কর্ম, সততা, ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে একটি জনপদের ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন। সময়ের নিয়মে তাঁরা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁদের স্মৃতি, আদর্শ ও অবদান মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। ভোগডাবুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম ছকিকুল আলম খোকন ছিলেন তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন ডোমার উপজেলার অসংখ্য মানুষ।
তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক পরিচিত দৃশ্য। মিষ্টি রঙের সাফারি পোশাক, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর দৃপ্ত পদচারণা, গম্ভীর অথচ প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্ব। দূর থেকেই তাঁকে আলাদা করে চেনা যেত। তাঁর উপস্থিতিই যেন আশপাশের পরিবেশে এক ধরনের নেতৃত্বের আবহ তৈরি করত। ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃঢ়তায় তিনি ছিলেন একজন স্বতন্ত্র মানুষ।
ভোগডাবুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব ছিল ইউনিয়নের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো ডোমার উপজেলাজুড়ে। জনসেবাকে তিনি কখনো কেবল দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি, বরং মানুষের কল্যাণকেই জীবনের অন্যতম অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অসহায় মানুষের বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার জন্য তিনি ছিলেন সর্বমহলে সম্মানিত।
স্থানীয় উন্নয়নের নানা উদ্যোগে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগে তিনি আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণ করতেন। মানুষের সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের চেষ্টা করা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই দল-মত নির্বিশেষে তিনি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন।
তিনি ছিলেন একজন সংস্কৃতিপ্রেমী ও উদার মানসিকতার মানুষ। সারগাম সাংস্কৃতিক পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি সংস্কৃতি চর্চাকে সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখতেন। যদিও তিনি নিজে সরাসরি সাংস্কৃতিক বা ক্রীড়া অঙ্গনের কর্মী ছিলেন না, তবুও নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে সবসময় উৎসাহ দিতেন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন সফল করতে তিনি নীরবে সহযোগিতা করতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি সুস্থ, সচেতন ও মানবিক সমাজ গঠনে সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ক্রীড়ার বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সহজ-সরল, আন্তরিক এবং বিশ্বাসযোগ্য একজন অভিভাবক। গ্রামের কোনো অসহায় মানুষ, দরিদ্র পরিবার কিংবা সামাজিক সংকটের সংবাদ পেলে তিনি যথাসাধ্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করতেন। মানুষের প্রতি তাঁর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি, কর্ম এবং মানবিকতার গল্প এখনও মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসে। পুরোনো কোনো আড্ডা, রাজনৈতিক আলোচনা কিংবা স্মৃতিচারণের আসরে তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই যেন অতীতের সেই দিনগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয়, এই বুঝি মিষ্টি রঙের সাফারি পোশাক পরে, পরিচিত সেই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে আবারও মানুষের মাঝে এসে দাঁড়াবেন।
একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর পদবিতে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে তিনি কতটা জায়গা করে নিতে পেরেছেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন। মরহুম ছকিকুল আলম খোকন তাঁর কর্ম, নেতৃত্ব, সততা, সাহস, মানবিকতা এবং জনকল্যাণমূলক অবদানের মাধ্যমে সেই সম্মান অর্জন করেছিলেন। তাই সময়ের পরিক্রমায় তাঁর শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও তিনি আজও মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং স্মৃতির পাতায় অমর হয়ে আছেন।
'দৈনিক দ্বীনের আলো'-এর পক্ষ থেকে মরহুম ছকিকুল আলম খোকনের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র সম্মান। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকে এই শোক সইবার তাওফিক দান করুন। আমীন।
Post a Comment