দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে চিলাহাটির ‘পাখির গ্রাম’, প্রতিদিন ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ভোগডাবুড়ি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চিলাহাটি এলাকার পশ্চিম ডাঙ্গাপাড়া গ্রামটি এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে পরিচিত ‘পাখির গ্রাম’ নামে। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা শতবর্ষী বাঁশঝাড়ে বছরের পর বছর ধরে নিরাপদে বসবাস করছে হাজার হাজার দেশীয় পাখি। পাখিদের অবাধ বিচরণ, ভোরের কিচিরমিচির আর সন্ধ্যার মনোমুগ্ধকর ফিরে আসার দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় ৪ একর ২০ শতাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ প্রাকৃতিক আবাসস্থলটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত। বিশাল বাঁশঝাড়, সবুজ পরিবেশ এবং নিরিবিলি আবহের কারণে পাখিগুলো এখানে নির্বিঘ্নে বসবাস করছে। প্রতিদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের সন্ধানে দলবেঁধে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পাখিরা। আবার সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে একে একে ফিরে এসে পুরো বাঁশঝাড় মুখর করে তোলে তাদের কোলাহলে। সেই অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করতে ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী, আলোকচিত্রী ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ।
পাখিদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত বাঁশঝাড়টির মালিক পরিবারও বসবাস করেন এর পাশেই। পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এ স্থানে পাখিদের বসবাস। কখনো কোনো পাখি শিকার করা হয়নি কিংবা তাদের ক্ষতি করা হয়নি। বরং পরিবারের সদস্যদের মতোই স্নেহ, মমতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে পাখিগুলোকে রক্ষা করা হয়েছে।
বাঁশঝাড়ের মালিক মজিদুল ইসলাম বলেন, “প্রায় ২০০ বছর ধরে আমাদের পরিবার এসব পাখিকে আগলে রেখেছে। আমার বাবা, দাদা এবং তাদের পূর্বপুরুষরাও একইভাবে পাখিদের রক্ষা করেছেন। তবে বর্তমানে পরিবেশের পরিবর্তন, গাছপালা কমে যাওয়া এবং জলাশয়ের সংকটের কারণে পাখির সংখ্যা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা চাই সরকার ও প্রশাসন আশপাশে আরও পুকুর খনন, দেশীয় গাছ লাগানো এবং এই এলাকাকে সংরক্ষিত প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিক।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছরের নির্দিষ্ট সময় নয়, প্রায় সারা বছরই এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতি দেখা যায়। ফলে এটি শুধু স্থানীয়দের নয়, জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করা হলে ভবিষ্যতে এটি পরিবেশ শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রকৃতি পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সায়লা সাইদ তন্বী বলেন, “চিলাহাটিতে পাখিদের একটি নিরাপদ আবাসস্থল রয়েছে, বিষয়টি আমাদের জানা আছে। সম্প্রতি পাখিদের খাবারের সুবিধার জন্য সেখানে একটি পুকুর খনন করা হয়েছে। বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কীভাবে এই প্রাকৃতিক আবাসস্থলকে আরও সমৃদ্ধ, সংরক্ষিত ও টেকসই করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে। ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, মানুষের সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের সমন্বয়ে চিলাহাটির এই ঐতিহ্যবাহী ‘পাখির গ্রাম’ শুধু নীলফামারীর নয়, সারা দেশের একটি অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।
Post a Comment